ব্রেকিং নিউজ :
সোনারগাঁ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মী সভা অনুষ্ঠিত সোনারগাঁয়ে স্বেচ্ছাসেবক দলের দোয়া মাহফিল সোনারগাঁয়ে অভিনব কায়দায় মিশুক চুরি সোনারগাঁয়ে ভারত বাংলাদেশ সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক উৎসব অনুষ্ঠিত বন্দর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্যালিয়েটিভ কেয়ার কার্যক্রমের উদ্বোধন সোনারগাঁয়ে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ সোনারগাঁয়ে ভূমিদস্যুতা নিয়ে পাল্টাপাল্টি মানববন্ধন কারাবন্দী নেতাদের পরিবারের সদস্যদের পাশে স্বেচ্ছাসেবক দল সোনারগাঁয়ে স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়কের মুক্তির দাবিতে মহাসড়কে বিক্ষোভ সোনারগাঁয়ে মিথ্যা মামলায় বিএনপি’র নেতাকর্মীদের আটকের ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ

ধীরে বহে মেঘনা

খায়রুল আলম খোকনঃ

 

মেঘনার বুকে জেগে উঠা ছোট্ট দ্বীপ নুনেরটেকে আমার জন্ম। চারদিকে মেঘনার জলরাশি। পালতোলা নৌকায় ছুটে চলা। নদীতে জাল ফেলে মাছ ধরা। মেঘনার টলটল স্বচছ পানিতে দাবরিয়ে সাতাঁরের স্মৃতি নিয়েই বেড়ে উঠা। মেঘনা নদী ঘিরে কত যে স্মৃতি তা লিখে শেষ করা যাবে না। বাড়ির পাশ দিয়ে বিশাল বড় পাল তোলা নৌকা যেতো সকাল বিকাল। সকালে নদীর ঘাটে ওজু করে মক্তবে যাওয়ার সময় বন্ধুরা মিলে পাল তোলা নৌকা গুনে যেতাম আজ কে কয়টা পাল তোলা নৌকা দেখেছি তার হিসাব নিয়ে বসতাম বিকেল বেলা খেলার মাঠে।

দুপুরে গোসলের সময় ঠেলা জালি জাল দিয়ে ছোট ইচা মাছ ধরতাম (চিংড়ি)মাছ যাকে গ্রামে দুরা মাছ বলে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই মাছ রাখার বান্ড ভরে যেত। সে মাছ বাড়ি নিয়ে আসলে মা চাচিরা খুব খুশি হতেন। নিজেরা রেখে প্রতিবেশি ও আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে নিয়ে যেতাম। এখন তো তা চোখেই পরে না। আর সেই মাছও তো বেশি দেখা যায় না।

 

কখনো টেঁটা দিয়ে খালি নদীতে অনেক ক্ষণ আঘাত করলে দেখা যেতো বাইম, গজার, শোলসহ নানা প্রকারের মাছ ধরা পরতো। সখের বসে গোসলের সময় আবার নদীতে জাল ফেলে কিছুক্ষন বসে থাকলে পরে সে জাল উঠালে খাবারের মাছ রেখেও কখনো বিক্রি করা যেতো। কখনো কখনো ডুবিয়ে এবং ডোবা নালা থেকে হাতিয়ে কৈ, মাগুর, বাইম, পুটিসহ নানা প্রকারের মাছ ধরে নিয়ে আসতাম বাড়িতে।

 

বাড়ির পাশের নদীতে অনেক সময় নৌকা বেয়ে যাওয়ার সময় নৌকার ঢেউ অথবা বৈঠার চালানোর আওয়াজে মাছ নৌকায় লাফিয়ে পরতো।
নদীতে ঘন্টার পর ঘন্টা সাতার কাটতাম, মাছ ধরতাম, পাল তোলা নৌকা নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে যেতাম। এখনকার মতো আগে ইঞ্জিন চালিত নৌকা ছিল না। বহু কষ্ট হতো হাতে নৌকা চালানো। কখনো বৈঠা, লগি অথবা বাতাস অনুকুলে হলে পালতোলে নৌকা নিয়ে যাওয়া আসা করা সহজ হতো। স্রোত আর বাতাসের প্রতিকুলে হলে তো কষ্টের শেষ ছিল না।

 

একবার ঝড়ের দিনে এক পাল তোলা নৌকা গ্রামে এসে হাজির। সকালে গিয়ে দেখি বিশাল বড় ধানের নৌকা। ধান বিক্রি করে আসার সময় ডাকাতের কবলে পরে সব হারিয়ে নিঃশ্ব হয়ে আছে। নৌকার মাঝি মাল্লারা অসহায়ের মতো গ্রামের লোকদের বলছেন আমরা নিঃশ্ব, নৌকায় খাবার নেই, যাওয়ার মতো কোন উপায় নেই। ডাকাতরা ডাকাতি করে টাকা পয়সা লুট করে নিয়ে যাওয়ার সময় নৌকার বৈঠা নদীতে ফেলে দিয়ে গেছে। নৌকা ভেসে আপনাদের গ্রামে এসে ভিরে। পরে এলাকাবাসী গ্রাম থেকে চাল ডাল, টাকা পয়সা তুলে তাদের সহায়তা করেন।

 

বাংলা সাহিত্যে হাজারো নদীর কথা কবিতায় গানে, গল্প উপন্যাসে ব্যাপক ভাবে লিখা আছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তার বিখ্যাত উপন্যাস লিখেছেন ‘পদ্মা নদীর মাঝি’। বুদ্ধ দেব বসুর কবিতা ‘নদীর স্বপ্ন’। আল-মাহমুদ লিখেছেন তীতাস নদী নিয়ে।

 

এমন বহু কবিতা উপন্যাস, গল্প সাহিত্য রচনা করা হয়েছে নদী নিয়ে জীবনব্যাপি আমাদের সাহিত্য। সুদূর প্রবাসী কবি মাইকেল মধুসুধন দত্ত তো ‘কপোতাক্ষ নদ’ রচনা করে বিখ্যাত কবি হয়ে গেলেন। এমনি বহু কবি লেখক নিজ দেশের নদীকে ভালোবেসে জগৎ বিখ্যাত ব্যক্তি হয়েছেন।

 

আরেকটি ঘটনা হলো একবার ডাকাতদল লঞ্চে ডাকাতি কালে ডাকাতদের ভয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে এক লোক দশ মাইল পানিতে সাতার কেটে এক সময় আমাদের গ্রামের এক জেলের জালে লাগে। পরে বলে ভাই আমাকে বাঁচান আমাকে ডাকাতরা হামলা করেছে। আমি আপনাদের নৌকায় আশ্রয় চাই, আমার পরনে কোন কাপড় নাই, দয়া করে একটা কিছু দেন আমাকে। পরে তাকে গ্রামে নিয়ে আসলে ওই বাড়িতে গ্রামবাসীর ভির পরে যায়। পরে ওই লোকটাকে জামাকাপড় কিনে দিয়ে যাতায়াতের ভাড়াসহ তার গ্রামের বাড়ি বরিশালে পাঠানো হয়েছিল।

 

আরেকটা ঘটনা, দুই ভাই বর্ষা মৌসুমে ইলিশ মাছ ধরতে মেঘনা নদীর মুল মোহনায় জাল ফেলে।ওই নদী দিয়ে উত্তর এলাকার ইস্টিমার জাহাজ আসার সময় দুপুর বেলা এক ভাই জোহরের নামাজ পরছে আরেক ভাই ঘুমাচ্ছে। এরই মধ্যে জাহাজ নৌকার মাঝ দিয়ে উঠিয়ে দেয়। দুই ভাই যখন বুঝতে পারে সাথে সাথে ডুব দিয়ে বহু দূর গিয়ে ভেসে উঠে অন্য জেলেরা তাদের উদ্ধার করে। পরে দেখা যায় কয়েক মাইল ভাটিতে গিয়ে দু-খন্ড নৌকার সন্ধ্যান পায়। এঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছিল।

 

পাশের ঘরের কাকা বসন্ত রোগে শিশু কালেই দুটো চোখ অন্ধ হয়ে যায়। পরে তিনি এলাাকার লেডি জাল অর্থাৎ বেড় জাল দিয়ে মাছ ধরার কাজে যেতেন। তিনি অন্ধ হওয়ায় একা চলাফেরা করতে পারতেন না। কিন্তু অন্য কেউ তাকে ধরে সাথে নিয়ে গেলে কাজ করতে পারতেন ভালো। সাথের জন বলে ভাই আজ আকাশটা ভাল না। উত্তর আকাশে বেশ অন্ধকার করছে। মনে হয় আজ ঝড়-তুফান আসতে পারে। অন্ধ কাকা বলেন, আরে চল ঝড়-তুফান কি পেটে বুঝবে? কামাই না করলে সংসার চালাব কি করে। সাথে খাবার নেওয়ার সময় তিনি বলেন শোন, ঝড়-তুফানে আমি যদি মারা যাই, তবুও আমার থালাবাটি বাড়ি আসবে। লোকেরা হাসা হাসি শুরু করলেন। আপনি কি বলেন ভাই আমরা থাকতে আপনি কেন মরবেন। তিনি বলেন আরে ঝড়-তুফানে নৌকা ডুুবলে তোরা সাতরাইয়া তীরে উঠবি আমি যাব কই। সত্যিই রাতে ঝড়তুফান হয় আর তাদের নৌকা ডুবে যায়। অন্ধ কাকা তিনি ভাত খেয়ে তার থালা বাটি গামছায় বেধে আগেই নৌকার ছৈয়ে বেধে ছিল।

 

পরে জানা গেছে নৌকা ডুবির ঘটনায় বাপ ছেলে একসাথে দুইজন লোক মারা গেছে জালে মাছ ধরতে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে, আর নৌকায় থাকা কোন কিছু পাওয়া যায়নি নৌকা ছাড়া কিন্তু অন্ধ কাকার বেঁধে রাখা থালাবাটি ছিল অক্ষত। আল্লাহর দয়ায় তিনিও বেঁচে ছিলেন ওই সময়, ভাবলে মনে বিস্ময় লাগে। তিনি আজও বেঁচে আছেন।

 

জন্ম মেঘনার বুকে কিন্তু বেড়ে উঠা শহরে। কিন্তু নদী পথে প্রতিদিন কর্মক্ষেত্রে যেতে হয়। মনে ভীষণ ভয় হয় যখন ঝড় তুফান হয়। মনে নানা ভয়াবহ অতীতের বিভিন্ন সময় ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা। তবে নদীর তীরে যে ভাবে কলকারখানা, মেইল ফ্যাক্টরি গড়ে উঠেছে। তার কারণে, এলাকায় বায়ু দূষণ বেড়ে গেছে। শব্দ দূষণ বেড়ে গেছে। যানজট বেড়ে গেছে। নদীর পানি দূষণ বেড়ে গেছে।

 

জানি না আগামী কয়েক বছর পর কি হয় সোনারগাঁয়ের নদীর তীরের অবস্থা। মেঘনা পাড়ের মানুষের অবস্থা। রাজনৈতিক আগ্রাসনে ফসলি জমি, বসত বাড়ির পাশ থেকে বালি কেটে শেষ করে দিচ্ছে জন বসতি। নদী ভাংগনের ফলে কত মানুষ বাড়ি ঘর হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়ে এলাকা ছাড়া। এসব আগ্রাষণ থেকে রক্ষা পেতে হলে সকলেরই সচেতন হতে হবে। গড়ে তুলতে হবে জনমত। তাহলেই নদী ভাল থাকবে। নদী ভাল থাকলে দেশ ভাল থাকবে।

 

 

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2022 SOFT-MACK
Design & Developed BY SOFT-MACK